মোহাম্মাদ রোকনুজ্জামান: হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। মাদকের জোয়ারে ভাসছে রাজধানীর গোটা মিরপুর। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান ঘোর মাদকবিরোধী অভিযানকে তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যেই নানা রকম মরণনেশার রমরমা ব্যবসা চালিয়ে আসছে মিরপুরের কিছু চিহ্নিত ও সংঘবদ্ধ মাদক কারবারী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মিরপুরের হযরত শাহ আলী মাজারকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য দিবালোকে বসেছে মাদকের পাইকারি ও খুচরা বাজার। শতাধিক চিহ্নিত মাদক কারবারী প্রতিদিন কমপক্ষে আড়াই কোটি টাকার অর্থাৎ প্রতিমাসে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার মাদক বিক্রি করছে। আর বিভিন্ন মাদকদ্রব্য বিক্রির এই বিশাল অর্থের বড় একটি অংশ বিভিন্ন হাত ঘুরে পৌঁছে যাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসাধু কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার পকেটে।
অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সোমবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাজার শরিফের মূল প্রাঙ্গণে একেকটি গ্রুপে ১০-১২ জন করে জটলা পাকিয়ে গোল হয়ে প্রায় শতাধিক গ্রুপ বিভিন্ন প্রকার মাদকের পসরা সাজিয়ে বসেছে। এখানে চলছে সেবন ও পাইকারি-খুচরা বেচাকেনা।
দেখা গেল, মাজারের মূল ফটকের বামপাশে বেশ বড়সড় অক্ষরে লেখা রয়েছে পুলিশ কন্ট্রোল রুম। মাজারে নিয়োজিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মী জানান, পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়মিত কমপক্ষে পাঁচ-সাতজন পুলিশ ডিউটি করত। তখন মাদকের এমন রমরমা প্রকাশ্য হাট বসতে পারত না। প্রায় কয়েক মাস যাবত কোনো পুলিশ সদস্যকে এখানে ডিউটিতে আসতে দেখা যায় না।
"আপনারা মাজারের নিরাপত্তা কর্মী হয়েও বাধা কেন দেন না?"এমন প্রশ্নের উত্তরে তারা জানান, আমরা বাধা দিলে মারধর করে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, বিশেষ করে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের শাহ আলী থানা এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী।
এলাকাবাসীর অভিযোগ ও তাদের ভাষ্যমতে, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত রয়েছে মাদক বিক্রিতে। মাজার শরিফে আগন্তুক যে কাউকে প্রকাশ্য দিবালোকে ডেকে ডেকে বিভিন্ন প্রকার মাদক কিনতে আহ্বান করছে এরা। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাজার শরিফের একজন দোকানদার বলেন, মাজারকেন্দ্রিক যারা মাদক বিক্রি করছে তাদের বেশিরভাগই ভাসমান সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোর ও ভ্রাম্যমাণ পতিতা। তবে নেপথ্যে থেকে এদের নিয়ন্ত্রণ করছে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এবং এলাকার চিহ্নিত কিশোর গ্যাংয়ের কিছু সদস্য। বিশেষ করে উত্তর বিশিলের ছোট মাজারের সিন্নি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে মাদক ব্যবসায়ী সুজন, নাজমা, লাবনী, পিংকি, রুমা, সাথীসহ বেশ কয়েকজনের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট প্রকাশ্যেই নিয়ন্ত্রণ করছে এদের। তবে এদের পেছনে রয়েছে বড় বড় রাঘববোয়াল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, মিরপুর এলাকার বিভিন্ন ব্যস্ততম এলাকাভিত্তিক ছিনতাইকারী চক্রের অভয়াশ্রম এই মাজার শরিফ। প্রায় অর্ধশহস্রাধিক শিশু-কিশোর ছিনতাইকারীর সমন্বয়ে গঠিত এই সিন্ডিকেটের ছিনতাইকৃত মোবাইল ফোন, যন্ত্রাংশ, ব্যাগসহ মূল্যবান সামগ্রী আনিসের কাছেই জমা হয়। বিনিময়ে তাদের কপালে জোটে দু-একশ টাকা আর ডেন্ড্রাইট নামক এক কৌটা আঠা, যা এই মাদকাসক্ত ছিনতাইকারী শিশু-কিশোরদের নিকট একধরনের জনপ্রিয় মাদক।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের অত্যাচারে এলাকাবাসী চরম অসহায় হয়ে পড়েছে। মাদকের সহজলভ্যতায় এলাকার স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকে পড়ছে মাদকের দিকে। তাছাড়া স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্রীরাসহ এলাকার বিভিন্ন কারখানায় (গার্মেন্টস) কর্মরত নারীদের আসা-যাওয়ার পথে ইভটিজিংসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হয় মাদকসেবীদের হাতে।
চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকে বর্তমানে জেলহাজতেও রয়েছেন এবং কারাগার থেকেই তাদের বিশাল মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। চুরি, ছিনতাই আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিনীত অনুরোধ করছি, অতিসত্বর এসব চিহ্নিত মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে এলাকাবাসীকে উপদ্রুত সমস্যা থেকে পরিত্রাণের ব্যবস্থা করুন।
এ বিষয়ে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার বলেন, প্রকৃতপক্ষে এ বিষয়ে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। তবে আমরা মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা পেলে সে যে বা যারাই হোক, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আমি এখনই শাহ আলী থানার ওসিকে অভিযান পরিচালনার বিশেষ নির্দেশ দিচ্ছি।